মোবাইল ফোন কীভাবে আবিষ্কার হলো? ইতিহাস ও অজানা ১০টি তথ্য

মোবাইল ফোন কীভাবে আবিষ্কার হলো এবং এটি কোন প্রযুক্তিতে কাজ করে? প্রথম মোবাইল ফোনের ইতিহাস, আবিষ্কারক মার্টিন কুপার এবং মোবাইল সম্পর্কিত অজানা ১০টি তথ্য জানতে আর্টিকেলটি পড়ুন।

Oct 04, 2026 - 11:58
Updated: 4 days ago
0 0
মোবাইল ফোন কীভাবে আবিষ্কার হলো? ইতিহাস ও অজানা ১০টি তথ্য

মোবাইল ফোন কীভাবে আবিষ্কার হলো? কোন প্রযুক্তিতে কাজ করে ও অজানা ১০টি তথ্য

একবার ভেবে দেখুন তো, আজ সকালে ঘুম ভেঙেছে কীসের শব্দে? বেশিরভাগ মানুষের উত্তর একটাই: মোবাইলের অ্যালার্ম। অথচ মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেও কেউ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কাউকে ফোন করবে, এ কথা শুনলে মানুষ হেসে উড়িয়ে দিত। তাহলে এই ছোট্ট যন্ত্রটা কীভাবে এল? তারবিহীন অবস্থায় আপনার কণ্ঠস্বর কীভাবে হাজার কিলোমিটার দূরে পৌঁছে যায়? এই লেখায় আমরা ধাপে ধাপে সেই গল্পটাই জানব।

আমার নিজের প্রথম মোবাইল ছিল একটি পুরনো বাটন ফোন। তখন সিগন্যালের জন্য মাঝে মাঝে ছাদে উঠতে হতো। সেই সময় থেকেই ভাবতাম, এই যন্ত্র আসলে কাজ করে কীভাবে? পরে প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা আর লেখালেখি করতে গিয়ে উত্তরগুলো একটু একটু করে পেয়েছি। যা জেনেছি, তা এখানে সহজ ভাষায় সাজিয়ে দিলাম।

এই লেখায় যা যা জানবেন

মোবাইল ফোনের আগের গল্প: বেতার তরঙ্গের আবিষ্কার

মোবাইল ফোন একদিনে আবিষ্কার হয়নি। এর পেছনে কয়েক দশকের বিজ্ঞানচর্চা আছে। আর এই গল্পের শুরু মোবাইলেরও অনেক আগে।

ম্যাক্সওয়েল, হার্জ ও বেতার তরঙ্গ

উনবিংশ শতাব্দীতে স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল গাণিতিকভাবে দেখালেন যে বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব মিলে তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। ১৮৮০-র দশকে জার্মান পদার্থবিদ হাইনরিখ হার্জ পরীক্ষার মাধ্যমে সেই তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। তাঁর নামেই কম্পাঙ্কের একক "হার্জ"। এরপর গুলিয়েলমো মার্কনি এই তরঙ্গ ব্যবহার করে তারবিহীন বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা দাঁড় করান। মোবাইল ফোনের পুরো ভিত্তি এই বেতার তরঙ্গ।

বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রতীকী ছবি

গাড়ির ফোন: প্রথম ধাপ

১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল টেলিফোন সেবা চালু হয়। কিন্তু এটা এখনকার মতো নয়। যন্ত্রটি এত ভারী ছিল যে গাড়ির বুটে বসাতে হতো। তাছাড়া একই এলাকায় একসঙ্গে খুব অল্প কয়েকজন কথা বলতে পারতেন, কারণ চ্যানেল ছিল সীমিত। প্রযুক্তি ছিল, কিন্তু ব্যবস্থাটা বড় পরিসরে চালানোর মতো ছিল না। সেই সমস্যার সমাধানই এল পরের ধাপে।

সেলুলার ধারণা: পুরো ব্যবস্থার মূল বুদ্ধি

মোবাইল ফোনকে ইংরেজিতে "সেল ফোন" বা "সেলুলার ফোন"ও বলা হয়। কারণটা জানলেই এর কার্যপদ্ধতির মূল চাবিকাঠি বোঝা যায়।

১৯৪৭ সালে বেল ল্যাবসের প্রকৌশলী ডগলাস রিং ও রে ইয়ং একটি ধারণা দেন। একটা বিশাল এলাকাকে একটিমাত্র শক্তিশালী ট্রান্সমিটার দিয়ে ঢাকার বদলে অনেকগুলো ছোট ছোট "সেল" বা ঘরে ভাগ করা হবে। প্রতিটি সেলে থাকবে একটি করে টাওয়ার, যাকে বলে বেস স্টেশন। পাশাপাশি দুটি সেলে আলাদা কম্পাঙ্ক ব্যবহার হবে। কিন্তু একটু দূরের সেলে সেই কম্পাঙ্কই আবার নতুন করে ব্যবহার করা যাবে। একে বলে ফ্রিকোয়েন্সি রিইউজ।

একটি সহজ উদাহরণ দিই। ধরুন একটা শহরে একটি ঘরে আপনি আর আপনার বন্ধু কথা বলছেন। পাশের বাড়িতেও কয়েকজন কথা বলছে। দূরত্বের কারণে দুই বাড়ির কথা একে অপরকে বিরক্ত করছে না। ফলে সবাই একই ভাষা বা একই "স্বরমাত্রা" দিয়ে চালিয়ে নিতে পারছে। সেলুলার ব্যবস্থা অনেকটা এই রকম। এই বুদ্ধির কারণেই সীমিত কম্পাঙ্ক দিয়েও কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে কথা বলতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ্যান্ডঅফ। আপনি চলন্ত গাড়িতে কথা বলছেন। এক সেলের এলাকা ছেড়ে অন্য সেলে ঢোকার সময় নেটওয়ার্ক আপনার কলটিকে নিঃশব্দে এক টাওয়ার থেকে আরেক টাওয়ারে সরিয়ে দেয়। আপনি টেরও পান না। এই কাজটাই সেলুলার প্রযুক্তিকে বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য করেছে।

১৯৭৩ সালের সেই ঐতিহাসিক কল

১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল নিউইয়র্কের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মটোরোলার প্রকৌশলী মার্টিন কুপার একটি হাতে ধরা যন্ত্র থেকে ফোন করলেন। প্রথম হাতে-বহনযোগ্য মোবাইল কল ছিল এটাই। তিনি ফোন করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান বেল ল্যাবসের গবেষক জোয়েল এঙ্গেলকে। বলা হয়, তিনি জানিয়েছিলেন যে তিনি একটি সত্যিকারের হাতে ধরা মোবাইল ফোন থেকে কথা বলছেন।

তাঁর সেই প্রোটোটাইপের নাম ছিল ডায়নাট্যাক (DynaTAC)। ওজন ছিল প্রায় ১.১ কেজি। চার্জ হতে লাগত প্রায় দশ ঘণ্টা, অথচ কথা বলা যেত মাত্র আধঘণ্টার মতো। এরপর আরও দশ বছর লেগে যায় বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসতে। ১৯৮৩ সালে ডায়নাট্যাক ৮০০০এক্স বিক্রি শুরু হয়, দাম ছিল প্রায় ৩,৯৯৫ ডলার। তখন এটা ছিল শুধু ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষের জিনিস।

আধুনিক স্মার্টফোন টেবিলের ওপর রাখা

মোবাইল ফোনের আবিষ্কারক কে?

সত্যি বলতে একজন একক আবিষ্কারক নেই। বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার করেছেন ম্যাক্সওয়েল ও হার্জ। সেলুলার ধারণা এসেছে বেল ল্যাবসের প্রকৌশলীদের কাছ থেকে। প্রথম হাতে-বহনযোগ্য মোবাইল ফোনের কল করার কৃতিত্ব মার্টিন কুপারের। আর এর পেছনে ছিল অসংখ্য প্রকৌশলী, যাঁরা ব্যাটারি, চিপ ও নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। তাই "কে আবিষ্কার করেছেন" প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো, এটা অনেক মানুষের সম্মিলিত কাজ।

১জি থেকে ৫জি: প্রজন্মের পরিবর্তন

মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রতিটি বড় উন্নতিকে বলা হয় এক-একটি "জেনারেশন" বা প্রজন্ম। নিচের টেবিলে সংক্ষেপে দেখে নিন।

প্রজন্ম কবে থেকে মূল বৈশিষ্ট্য
১জি ১৯৭৯ সালে জাপানে প্রথম বাণিজ্যিক চালু অ্যানালগ সংকেত, শুধু ভয়েস কল, ধারণক্ষমতা কম
২জি ১৯৯১ সালে ফিনল্যান্ডে জিএসএম চালু ডিজিটাল ভয়েস, এসএমএস, সিম কার্ড
৩জি ২০০১ সালে জাপানে প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল ইন্টারনেট, ভিডিও কল, ওয়েব ব্রাউজিং
৪জি (এলটিই) ২০০৯ সালের শেষে স্টকহোম ও অসলোতে দ্রুত ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং, অ্যাপভিত্তিক জীবন
৫জি ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে অতি দ্রুত গতি, কম বিলম্ব, আইওটি ও স্মার্ট ডিভাইসের জন্য উপযোগী

এখানে একটি মজার বিষয় লক্ষ করুন। ২জি-তেই প্রথম ফোনের কথা ডিজিটাল তথ্যে রূপান্তরিত হয়ে যেতে শুরু করে। ঠিক তখনই এসএমএস সম্ভব হয়। ১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর নিল প্যাপওয়ার্থ ভোডাফোনের নেটওয়ার্কে প্রথম এসএমএস পাঠান, যার বার্তা ছিল "Merry Christmas"। আর এসএমএসের সীমা ১৬০ অক্ষর কেন, তা নিয়ে প্রচলিত গল্প হলো, প্রকৌশলী ফ্রিডহেলম হিলেব্র্যান্ড সাধারণ পোস্টকার্ড ও টেলেক্স বার্তার দৈর্ঘ্য গুনে দেখেছিলেন যে বেশিরভাগ বার্তা এর মধ্যেই আটকে যায়।

একটি কল কীভাবে আপনার কাছে পৌঁছায়: ধাপে ধাপে একটি উদাহরণ

তত্ত্ব তো অনেক হলো। এবার একটি বাস্তব উদাহরণ ধরে দেখি। মনে করুন, ঢাকার রাহিম সিলেটে থাকা তার মাকে ফোন করছে।

  1. কণ্ঠস্বর ডিজিটাল হয়: রাহিমের কথা ফোনের মাইক্রোফোনে বিদ্যুৎ-সংকেত হয়ে যায়। চিপ সেটাকে ০ ও ১-এর ডিজিটাল তথ্যে রূপ দেয় এবং সংকুচিত করে।
  2. বেতার তরঙ্গে পাঠানো: ফোনের অ্যান্টেনা সেই তথ্য বেতার তরঙ্গ হিসেবে কাছের টাওয়ারে পাঠায়।
  3. টাওয়ার থেকে নেটওয়ার্কে: টাওয়ার সংকেতটি তার বা অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে অপারেটরের মূল নেটওয়ার্ক কেন্দ্রে পাঠায়।
  4. ঠিকানা খোঁজা: নেটওয়ার্কের তথ্যভান্ডার দেখে নেয় মায়ের সিম এখন কোন এলাকার কোন টাওয়ারের আওতায় আছে।
  5. সিলেটের টাওয়ারে পৌঁছানো: সেই টাওয়ার সংকেতটি আবার বেতার তরঙ্গ হিসেবে মায়ের ফোনে পাঠায়।
  6. আবার শব্দে রূপান্তর: মায়ের ফোন ডিজিটাল তথ্য খুলে স্পিকারে কথা হিসেবে বাজিয়ে দেয়।

পুরো প্রক্রিয়া ঘটে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে। আর দুজনের কথা দুই দিকেই একসঙ্গে চলে। তাই কথোপকথন স্বাভাবিক লাগে।

মোবাইলের ভেতরের সার্কিট ও চিপের প্রতীকী ছবি

মোবাইলের ভেতরের প্রযুক্তি

এবার ফোনের ভেতরটা একটু খুলে দেখা যাক। একটি আধুনিক স্মার্টফোনে অনেকগুলো প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে।

প্রসেসর বা এসওসি (SoC)

ফোনের মস্তিষ্ক হলো এসওসি, অর্থাৎ সিস্টেম-অন-এ-চিপ। একটি ছোট চিপের মধ্যেই সিপিইউ, গ্রাফিক্স প্রসেসর, মডেম ও আরও অনেক অংশ থাকে। এই চিপের কম্পিউটিং ক্ষমতা অ্যাপোলো যুগের মহাকাশযানের কম্পিউটারের চেয়ে বহু গুণ বেশি।

ব্যাটারি

বেশিরভাগ ফোনে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থাকে। ১৯৯১ সালে সনি এই ধরনের ব্যাটারি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনে। ছোট জায়গায় বেশি শক্তি জমিয়ে রাখতে পারে বলেই এটি মোবাইলের জন্য এত উপযোগী।

টাচস্ক্রিন

বেশিরভাগ ফোনে ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিন ব্যবহার হয়। আপনার আঙুলের মধ্যে সামান্য বিদ্যুৎ পরিবাহিতা আছে। আঙুল স্ক্রিন ছুঁলে সেই জায়গার বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র সামান্য বদলে যায়। ফোন সেই পরিবর্তন মেপে বুঝে নেয় আপনি ঠিক কোথায় ছুঁয়েছেন। এ কারণেই সাধারণ গ্লাভস পরে টাচস্ক্রিন চালাতে অসুবিধা হয়।

ক্যামেরা

ফোনের ক্যামেরায় থাকে সিমস (CMOS) সেন্সর, যা আলোকে বিদ্যুৎ-সংকেতে রূপ দেয়। ২০০০ সালে জাপানে শার্পের জে-এসএইচ০৪ মডেলকে প্রথম বাণিজ্যিক ক্যামেরা ফোন ধরা হয়। এখনকার ক্যামেরায় সফটওয়্যারের ভূমিকা প্রায় লেন্সের সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সেন্সর

অ্যাক্সিলারোমিটার ও জাইরোস্কোপের মতো ক্ষুদ্র সেন্সর ফোনকে বুঝতে সাহায্য করে সেটি কোন দিকে কাত হয়ে আছে বা কত দ্রুত নড়ছে। তাই ফোন ঘোরালে স্ক্রিনও ঘুরে যায়। জিপিএস চিপ মহাকাশের কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে সংকেত নিয়ে আপনার অবস্থান হিসাব করে।

সিম কার্ড ও আইএমইআই

সিম (SIM) মানে সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিটি মডিউল। এটি নেটওয়ার্ককে জানায় আপনি কোন গ্রাহক। আর প্রতিটি ফোনের নিজস্ব একটি ১৫ সংখ্যার আইএমইআই নম্বর থাকে। ফোনের ডায়ালারে *#06# লিখলেই তা দেখা যায়। ফোন হারালে এই নম্বরই কাজে লাগে।

স্মার্টফোনের যুগ

মোবাইলকে স্মার্ট করার প্রথম ধাপ আইবিএমের "সাইমন"। ১৯৯২ সালে প্রদর্শিত এবং ১৯৯৪ সালে বিক্রি হওয়া এই ফোনে টাচস্ক্রিন, ইমেইল ও ক্যালেন্ডার ছিল। তাই একে প্রথম স্মার্টফোন বলা হয়। কিন্তু ব্যাটারি ও দামের কারণে তা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়নি।

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে অ্যাপল আইফোন ঘোষণা করে, আর ওই বছরের ২৯ জুন তা বাজারে আসে। মাল্টি-টাচ স্ক্রিন ও অ্যাপের ধারণা ফোন ব্যবহারের ধরনই বদলে দেয়। এর কিছুদিন পর, ২০০৮ সালের অক্টোবরে প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ফোন এইচটিসি ড্রিম বাজারে আসে। ওপেন-সোর্স অ্যান্ড্রয়েডের কারণে বিভিন্ন কোম্পানি তুলনামূলক কম দামে স্মার্টফোন বানাতে পারল। এর ফলে স্মার্টফোন ধনী-গরিব নির্বিশেষে অনেক মানুষের হাতে পৌঁছাল।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের যাত্রা

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন সেবা শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে। ১৯৯৩ সালে সিটিসেল প্রথম মোবাইল সেবা চালু করে। ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোন জিএসএম সেবা শুরু করে। এরপর একে একে আসে অন্য অপারেটর। ২০১২ সালে টেলিটকের মাধ্যমে ৩জি যাত্রা শুরু হয় এবং ২০১৩ সালে অন্যান্য অপারেটরও ৩জি চালু করে। ২০১৮ সালে ৪জি সেবা শুরু হয়। ৫জি নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম হয়েছে। এর সর্বশেষ অবস্থা জানতে অপারেটরদের সরকারি ঘোষণা দেখে নেওয়াই ভালো।

স্মার্টফোন হাতে নিয়ে ব্যবহার করছেন একজন মানুষ

কেস স্টাডি: মোবাইল ব্যাংকিং ও গ্রামের মানুষ

মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার যন্ত্র থাকেনি, বাংলাদেশে তা অর্থনৈতিক জীবনেরও অংশ হয়ে গেছে। ২০১১ সালের জুলাইয়ে বিকাশ যাত্রা শুরু করে। আগে শহরে কাজ করা একজন শ্রমিককে গ্রামে টাকা পাঠাতে হলে হয় নিজে যেতে হতো, নয়তো কারও হাতে পাঠাতে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডে মোবাইলেই টাকা পৌঁছে যায়। আমি নিজে আমার এলাকার অনেক মানুষকে দেখেছি, যাঁরা আগে ব্যাংকের কাছেই যাননি, কিন্তু এখন মোবাইলে বিল দেন ও টাকা পাঠান। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে মোবাইল প্রযুক্তির প্রভাব কেবল বিনোদনে নয়, জীবনযাত্রায়ও।

মোবাইল নিয়ে ১০টি অজানা তথ্য

  1. প্রথম মোবাইল কলের দিনটি ছিল ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল, আর ফোনের ওজন ছিল প্রায় ১.১ কেজি।
  2. নোকিয়া ১১০০ মডেলের বিক্রি ২৫ কোটির বেশি বলে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়। এটি ইতিহাসের অন্যতম বেশি বিক্রিত ফোন।
  3. জনপ্রিয় "স্নেক" গেম প্রথম নোকিয়ার ফোনে আসে ১৯৯৭ সালে, নোকিয়া ৬১১০ মডেলে।
  4. আপনার ফোন জিপিএসের জন্য কোনো সংকেত পাঠায় না। এটি শুধু উপগ্রহ থেকে সংকেত গ্রহণ করে অবস্থান হিসাব করে।
  5. প্রতিটি ফোনের একটি স্বতন্ত্র ১৫ সংখ্যার আইএমইআই নম্বর থাকে।
  6. পৃথিবীর জনসংখ্যার চেয়েও বেশি মোবাইল সংযোগ (সিম) এখন চালু আছে, কারণ অনেকেই একাধিক সিম ব্যবহার করেন।
  7. প্রথম এসএমএসের বার্তা ছিল শুধু "Merry Christmas"।
  8. ফোনের টাচস্ক্রিন আঙুলের বৈদ্যুতিক ধর্ম ব্যবহার করে কাজ করে, চাপের ওপর নির্ভর করে না।
  9. অনেকে বলেন, অভিনেত্রী হেডি ল্যামার ও সুরকার জর্জ অ্যান্থাইল ১৯৪২ সালে যে "ফ্রিকোয়েন্সি হপিং" পেটেন্ট করেন, তার ধারণা পরে ব্লুটুথ ও ওয়াই-ফাইয়ের মতো প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত স্প্রেড স্পেকট্রামের সঙ্গে মেলে। তবে বিষয়টি সরাসরি উৎস নয়, ধারণাগত মিল বলাই নিরাপদ।
  10. একটি জিএসএম টাওয়ারের তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ সীমা প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। বাস্তবে শহরে এই দূরত্ব অনেক কম, কারণ অনেক টাওয়ার ঘনভাবে বসানো থাকে।

মোবাইল ব্যবহারে কিছু সচেতনতা

মোবাইল রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি শক্তি ব্যবহার করে, তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক ব্যবহারে নিশ্চিত কোনো ক্ষতি প্রমাণিত হয়নি। তবে গবেষণা চলছে। তাই কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চলা ভালো:

  • দীর্ঘ কলে ইয়ারফোন বা স্পিকার ব্যবহার করুন।
  • রাতে ঘুমানোর সময় ফোন বিছানা থেকে একটু দূরে রাখুন।
  • অতিরিক্ত গরম ফোন চার্জে দেবেন না।
  • ডিভাইসের সফটওয়্যার নিয়মিত আপডেট রাখুন, এতে নিরাপত্তা ঠিক থাকে।

উপসংহার

মার্টিন কুপারের হাতে ধরা প্রথম কল থেকে শুরু করে আজকের স্মার্টফোন পর্যন্ত পথটা দীর্ঘ ও চমৎকার। এর পেছনে আছে বেতার তরঙ্গ, সেলুলার ধারণা, ডিজিটাল চিপ, ব্যাটারি ও সফটওয়্যারের সম্মিলিত অবদান। আমরা যে ফোনটি প্রতিদিন কোনো ভাবনা ছাড়াই ব্যবহার করি, তার প্রতিটি ছোট অংশের পেছনে একেকজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর বছরের পর বছরের শ্রম আছে। এবার আপনার হাতের ফোনটির দিকে তাকালে হয়তো একটু অন্যভাবে দেখবেন। লেখাটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন, আর কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানান।

Frequently Asked Questions

মোবাইল ফোনের কোনো একক আবিষ্কারক নেই। ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল মটোরোলার প্রকৌশলী মার্টিন কুপার প্রথম হাতে-বহনযোগ্য মোবাইল ফোন থেকে কল করেন। তবে এর ভিত্তি তৈরি করেছেন বেতার তরঙ্গের আবিষ্কারক বিজ্ঞানীরা এবং সেলুলার ধারণা দেওয়া বেল ল্যাবসের প্রকৌশলীরা।

আপনার কণ্ঠস্বর প্রথমে ডিজিটাল তথ্যে রূপ নেয়, তারপর বেতার তরঙ্গ হিসেবে কাছের মোবাইল টাওয়ারে যায়। সেখান থেকে অপারেটরের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যার কাছে ফোন করছেন, তার এলাকার টাওয়ারে পৌঁছায় এবং আবার তরঙ্গ হয়ে তার ফোনে যায়। ফোন সেটিকে আবার শব্দে রূপান্তর করে। পুরো প্রক্রিয়া এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে হয়।

১জি ছিল অ্যানালগ ও শুধু ভয়েস কলের জন্য। ২জি-তে ডিজিটাল ভয়েস ও এসএমএস এল। ৩জি-তে মোবাইল ইন্টারনেট ও ভিডিও কল সম্ভব হলো। ৪জি-তে ইন্টারনেট অনেক দ্রুত হলো এবং স্ট্রিমিং সহজ হলো। ৫জি-তে গতি আরও বেশি এবং বিলম্ব অনেক কম, যা স্মার্ট ডিভাইসের জন্য উপযোগী।

আইএমইআই হলো প্রতিটি মোবাইল ডিভাইসের ১৫ সংখ্যার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর। ফোনের ডায়ালারে *#06# লিখলে এটি দেখা যায়। ফোন হারালে বা চুরি হলে এই নম্বর দিয়ে অভিযোগ জানাতে সুবিধা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক ব্যবহারে নিশ্চিত কোনো ক্ষতি প্রমাণিত হয়নি, তবে গবেষণা চলছে। তাই সতর্কতা হিসেবে দীর্ঘ সময় কথা বলতে ইয়ারফোন বা স্পিকার ব্যবহার করা এবং রাতে ফোন বিছানা থেকে একটু দূরে রাখা ভালো।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User